বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:১৪ অপরাহ্ন
সুন্দরবন এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এই সুন্দরবন রক্ষায় আমাদের করণীয় বিষয়ে কিছু আলোচনা করবো। সর্ব প্রথমে বলতে চাই সুন্দরবনকে পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ থেকে রক্ষা করতে হবে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন করতে হবে এবং পুনর্ব্যবহার যোগ্য বিকল্পের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে হবে এবং সরকারের এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সুন্দরবন, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। যা বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অংশে বিস্তৃত। সুন্দরবন বর্তমানে প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণের শিকার। দূষণ রোধে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেয়া যেতে পারে।
ব্যক্তিগত পর্যায় যদি বলি, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক যেমন – পলিব্যাগ, পানির বোতল, স্ট্র, কফি কাপ ইত্যাদি বর্জন করা এবং কাপড়ের ব্যাগ, মেটাল বা কাঁচের বোতল, কাগজের স্ট্র ইত্যাদি ব্যবহার করা।পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য ব্যবহার করা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইকেল করা। প্লাস্টিক বর্জ্য যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা। সুন্দরবনে পর্যটকরা ভ্রমণে গেলে ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্য সাথে নিয়ে আসা। স্থানীয় দোকান এবং বাজারে পরিবেশ-বান্ধব পণ্য ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা।
সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সুন্দরবন এলাকায় প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা।স্থানীয় সম্প্রদায় এবং পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। স্কুল-কলেজে পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। পরিবেশ-বান্ধব পণ্য ব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করা। সরকার কর্তৃক আইন প্রণয়ন ও তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা। প্লাস্টিক দূষণ রোধে গবেষণা এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা। সুন্দরবনের সুরক্ষার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করে আমরা সুন্দরবনকে প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে পারি। এছাড়াও সুন্দরবন রক্ষায় পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে। সৃষ্টি কর্তা প্রদত্ত এই বন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঢাল স্বরূপ কাজ করে কাজ করে। যে সুন্দরবন যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষকে প্রলয়ংকরী ঝড় তুফান বা সাইক্লোনের ছোবল থেকে দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের জীবন রক্ষা করে আসছে। সেই সুন্দরবনকে রক্ষা করার জন্য একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব অনেক।
জীব বৈচিত্র্যের বৃহত্তম আধার এই ম্যানগ্রোভ বনটি বাংলাদেশের অক্সিজেন ভান্ডার বা ফুসফুস হিসেবে আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অপরিসীম ভূমিকা পালন করছে। লাখ লাখ মানুষ সুন্দরবনের মাছ, মধু, গোলপাতা প্রভৃতি আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। সুন্দরবনের নদী-খাল বাংলাদেশের মাছের চাহিদার একটা বিরাট অংশ জোগান দিয়ে আসছে। সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সরকারও এ বন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করছে। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঝড়-ঘূর্ণিঝড়, ভৌগোলিক অবস্থান ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারনে সুন্দরবন এর জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে।
বাংলাদেশের উপর বয়ে যাওয়া সুপার সাইক্লোন সিডর, আইলা, বুলবুল, আম্পান ও সর্বশেষ ইয়াসের ছোবল থেকে সুন্দরবন নিজের জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলের মানুষকে রক্ষা করতে করতে আজ ক্লান্ত-শ্রান্ত। ভবিষ্যতেও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় উৎপন্ন হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছেন আবাহওয়াবিদরা। এসব অনাগত ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় সুন্দরবনকে প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য আমাদের যা কিছু করণীয় সব কিছু করতে হবে।
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল এবং বন সংলগ্ন জনপদের মানুষের সচেতনতা বাড়াতে তাদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সভা, সেমিনার, গীতিনাট্য, প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করতে হবে। সুন্দরবন ব্যবহারকারীদের বন ও বনজ সম্পদ সুরক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে হবে।
ইতিমধ্যে সুন্দরবনকে রক্ষা করার জন্য সামাজিক সংগঠন ‘রুপান্তর’ এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে আসছে। সুন্দরবন এরিয়ার কয়কটি উপজেলাকে ‘সুন্দরবন জোন’ এরিয়ায় ভাগ করে প্রতিটি উপজেলায়
সুন্দরবন রক্ষায়” ইয়ুথ ফর যুব ফোরাম ” কমিটি গঠন করে কাজ শুরু করেছে। তারা বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে। এই ফোরাম সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি, দূষণরোধ, এবং স্থানীয় যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সুন্দরবনের পরিবেশগত সমস্যা এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে যুব সমাজের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, দূষণরোধে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার কমানোর জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা। স্থানীয় যুবকদের সুন্দরবন সুরক্ষার কাজে যুক্ত করা এবং তাদের মধ্যে নেতৃত্ব বিকাশে সহায়তা করা। সুন্দরবনের সম্পদ পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা। সুন্দরবন এর আশেপাশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা। এই ফোরামের কার্যক্রমের মাধ্যমে সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় যুব সমাজের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে এবং সুন্দরবনকে আরও ভালোভাবে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।
লেখক : সাংবাদিক।
নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি, পিরোজপুর।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply